ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রথম সূরাটি হলো সুরা ফাতিহা। এটি এমন এক সূরা যার গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এই সূরাটি পড়া হয়। এই সূরাকে কুরআনের সারাংশ বলা হয়ে থাকে। আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো সুরা ফাতিহার অর্থ, উচ্চারণ, ফজিলত এবং এর নাজিলের পটভূমি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে।

সুরা ফাতিহার পরিচিতি
- সূরার নাম: আল-ফাতিহা (الْفَاتِحَة)
- অর্থ: শুরু, উদ্বোধন বা সূচনা
- সূরা নম্বর: ১
- আয়াত সংখ্যা: ৭
- নাজিলের স্থান: মক্কা
- অন্য নাম: উম্মুল কিতাব, আস-সাবআ আল-মাসানী, সুরা আশ-শিফা, সুরা আল-হামদ ইত্যাদি
সুরা ফাতিহার উচ্চারণ (আরবি ও বাংলা উচ্চারণ)
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
অর্থ: শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সব জগতের পালনকর্তা।
الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
আর-রাহমানির রাহিম
অর্থ: যিনি পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু।
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
মালিকি ইয়াওমিদ্দিন
অর্থ: বিচার দিনের মালিক।
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
ইয়্যাকা নাআবুদু ওয়াইয়্যাকা নাস্তা’ইন
অর্থ: আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য চাই।
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম
অর্থ: আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
সিরাতাল লাজিনা আন’আমতা আলাইহিম গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লিন
অর্থ: সেইসব লোকের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছো, তাদের পথ নয়, যাদের ওপর তোমার গজব নেমেছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
সুরা ফাতিহার অর্থ ও ব্যাখ্যা
সুরা ফাতিহা একদিকে দোয়া, আবার অন্যদিকে আল্লাহর প্রশংসা। এতে আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনা, দাসত্ব স্বীকার এবং সঠিক পথের দিশা চাওয়ার আবেদন রয়েছে। এটি মুসলমানদের জীবন চলার পথের দিক-নির্দেশনা।
এই সূরায় তিনটি মূল বার্তা রয়েছে:
- আল্লাহর গুণাবলি – করুণাময়তা, বিচার দিবসের মালিক হওয়া।
- ইবাদত ও দাসত্ব – শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত এবং সাহায্য প্রার্থনা।
- সঠিক পথের দোয়া – আল্লাহ যেন সঠিক পথ দেখান এবং পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করেন।
সুরা ফাতিহার ফজিলত
সুরা ফাতিহার ফজিলত অসাধারণ। হাদিসে এই সূরার অনেক গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ফজিলত তুলে ধরা হলো:
১. কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সূরা
রাসূল (সা.) বলেন:
“সুরা ফাতিহা হলো কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে মহৎ সূরা।” (সহীহ বুখারী)
২. সাবআ মাসানী (সাতবার পুনরাবৃত্ত আয়াত)
আল্লাহ বলেন:
“আমি তোমাকে দান করেছি সাবআ মাসানী ও মহামহিমান্বিত কুরআন।” (সূরা হিজর: ৮৭)
৩. রোগ মুক্তির জন্য উপকারী
হাদিসে বলা হয়, এক সাহাবী সুরা ফাতিহা পড়ে এক ব্যক্তিকে ঝাড়ফুঁক করলে সে সুস্থ হয়ে যায়। রাসূল (সা.) এটিকে স্বীকৃতি দেন। এজন্য এটিকে সুরা আশ-শিফাও বলা হয়।
৪. দোয়ায় সর্বোত্তম আবেদন
সুরা ফাতিহা পুরো একটি দোয়া, যা আমরা প্রতিদিন আল্লাহর কাছে বারবার পেশ করি। এতে রয়েছে জীবন চলার দিকনির্দেশনা।
সুরা ফাতিহার নাজিলের পটভূমি (শানে নুজুল)
সুরা ফাতিহা ইসলামের শুরুতেই নাজিল হয়। এটি ছিল নবী করিম (সা.)-এর উপর নাজিল হওয়া প্রথমদিককার মক্কী সূরাগুলোর একটি। এই সূরা দ্বারা নবীজীকে জানানো হয় কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়ার মানুষকে সঠিক পথের দাওয়াত দিতে হবে।
কিছু আলেমের মতে, এ সূরা ‘মদিনায়’ দ্বিতীয়বারও নাজিল হয়, কিন্তু অধিকাংশের মতে এটি ‘মক্কায়’ প্রথম নাজিল হয়।
সুরা ফাতিহা নামাজে আবশ্যিক কেন?
নামাজের প্রতিটি রাকাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করা ফরজ। হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ না করেই নামাজ পড়ে, তার নামাজ হয়নি।” (সহীহ মুসলিম)
সুতরাং, মুসলমানদের প্রতিদিনের ইবাদতে এটি একটি অপরিহার্য সূরা।
সুরা ফাতিহা থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?
- আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত।
- শুধু আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে।
- দুনিয়ার জীবন সরল পথে পরিচালিত হওয়া দরকার।
- গজবপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
- প্রতিদিন আল্লাহর সাহায্য কামনা করা উচিত।
সুরা ফাতিহা শুধু একটি সূরা নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের দিকনির্দেশনা। প্রতিদিন এই সূরা পাঠ করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে একটি গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলি। যারা এখনো এর অর্থ ও ব্যাখ্যা বোঝেননি, তারা আজই এটি আত্মস্থ করুন। কারণ সুরা ফাতিহার অর্থ জানলে আমাদের নামাজে মনোযোগ ও আত্মার প্রশান্তি আরও বৃদ্ধি পাবে।